আর্কাইভ | ঢাকা, সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬, ১ আষাঢ় ১৪৩৩, ২৮ জিলহজ্ব ১৪৪৭ ১১:১৩:৫২ অপরাহ্ন
Photo
আন্তর্জাতিক ডেস্ক 
ঢাকা, প্রকাশিতঃ
১৫ জুন ২০২৬
০৯:৪০:২০ পূর্বাহ্ন

যুক্তরাষ্ট্র -ইরান চুক্তি: বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত পাকিস্তান


যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে তিন মাস ধরে চলা সংঘাতের অবসান, হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্তকরণ এবং ধুঁকতে থাকা বিশ্ব অর্থনীতিতে স্বস্তি ফেরাতে একটি যুগান্তকারী চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এ সমঝোতায় পৌঁছানোর ক্ষেত্রে পাকিস্তানের বলিষ্ঠ মধ্যস্থতা সোমবার বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বিশ্বনেতারা এ ঐতিহাসিক উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন।


চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও দখলদার ইসরাইলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর মধ্যপ্রাচ্যে এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হয়, যা বিশ্বজুড়ে তীব্র জ্বালানি সংকট তৈরি করেছিল।

উপসাগরীয় অঞ্চলের এ তিন মাসব্যাপী সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে কাঙ্ক্ষিত শান্তি চুক্তির বিষয়টি সোমবার প্রথম প্রহরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ (সাবেক টুইটার) এক বার্তার মাধ্যমে নিশ্চিত করেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। তিনি জানান, আগামী শুক্রবার (১৯ জুন) সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিকভাবে এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে।

একই সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও তার নিজস্ব সামাজিক মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ যুদ্ধের অবসানের ঘোষণা দেন। ট্রাম্প বলেন, ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সঙ্গে চুক্তিটি এখন সম্পন্ন হয়েছে। সবাইকে অভিনন্দন! আমি হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ শুল্কমুক্তভাবে খুলে দেওয়ার অনুমোদন দিচ্ছি এবং একই সঙ্গে মার্কিন নৌবাহিনীর অবরোধ অবিলম্বে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিচ্ছি। বিশ্বের সমস্ত জাহাজ, তোমাদের ইঞ্জিন চালু করো। তেল সচল হতে দাও!’

মধ্যপ্রাচ্যের এ চরম সংঘাতের সময় পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকার বারবার প্রশংসা করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুদ্ধরত দুই দেশকে কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে এনে শান্তি চুক্তি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের নেতৃত্বকে কুর্নিশ জানিয়েছেন বিশ্বনেতারাও।

জাতিসংঘ, সৌদি আরব, কাতার, তুরস্ক, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, জাপান, নিউজিল্যান্ড এবং জার্মানির রাষ্ট্রপ্রধান ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পাকিস্তানের এ কূটনৈতিক সাফল্যের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তারা মনে করছেন, এ চুক্তি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন করে কূটনৈতিক আলোচনার পথ সুগম করবে।

জাতিসংঘ মহাসচিব

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ওয়াশিংটন ও তেহরানকে একটি শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এ চুক্তি অবিলম্বে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি, হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা এবং পরবর্তী আলোচনার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তৈরি করবে’।

বিশ্বের বিভিন্ন ক্ষেত্রে মারাত্মক প্রভাব ফেলা এ সংঘাত নিরসনে সালিশকারী হিসেবে পাকিস্তানের ভূমিকার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন জাতিসংঘ প্রধান। এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে গুতেরেস মন্তব্য করেন, ‘এটি সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানের দিকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ’।

সৌদি আরব

সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সামরিক অভিযান বন্ধ এবং একটি স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে ৬০ দিনের বিস্তারিত আলোচনা শুরু করতে ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সমঝোতাকে রিয়াদ স্বাগত জানায়’।

বিবৃতিতে শান্তির পথ সচল রাখতে অন্যান্য প্রধান দেশের পাশাপাশি পাকিস্তানের শান্তি বিনির্মাণ প্রচেষ্টার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়।

কাতার

কাতারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ড. মোহাম্মদ বিন আবদুল আজিজ আল-খুলাইফি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার এ দেশটিকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সমর্থনের পাশাপাশি এ প্রক্রিয়াটিকে সহজতর করার ক্ষেত্রে ইসলামিক রিপাবলিক অব পাকিস্তানের গঠনমূলক প্রচেষ্টার আমরা উচ্চ প্রশংসা করি’।

উপসাগরীয় এ দেশটি আশা প্রকাশ করে যে, এ শান্তি চুক্তি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে ত্বরান্বিত করবে এবং অমীমাংসিত বিষয়গুলোতে একটি ‘গঠনমূলক আলোচন’ এগিয়ে নেবে। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অপর এক বিবৃতিতে হরমুজ প্রণালীতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণসহ বিভিন্ন অমীমাংসিত বিষয়ে ‘ইউএস-ইরান সমঝোতা স্মারক’ তৈরিতে পাকিস্তানের ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়।

তুরস্ক

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোগান এক্সে দেওয়া এক পোস্টে এ চুক্তিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে শান্তি ও প্রশান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কাঙ্ক্ষিত কূটনৈতিক ফলাফল আনার পেছনে পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকাকে স্বীকৃতি দিয়ে তিনি বলেন, ‘ব্যতিক্রমী মধ্যস্থতা প্রচেষ্টার জন্য আমি পাকিস্তানকে ধন্যবাদ জানাই’। একই সঙ্গে শান্তি প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে এমন যেকোনো উসকানিমূলক বক্তব্য ও নাশকতা সম্পর্কে সতর্ক করেন তিনি।

যুক্তরাজ্য

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে চুক্তিটিকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ‘আমি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং পাকিস্তান, কাতার ও অন্যান্য দেশের মধ্যস্থতাকারীদের অভিনন্দন জানাই- যারা এ যুগান্তকারী সাফল্যে অবদান রেখেছেন’। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এ পদক্ষেপকে যুদ্ধ অবসান ও হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে ‘একটি বিশাল গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি’ হিসেবে অভিহিত করেন।

অস্ট্রেলিয়া

অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, ‘পাকিস্তান, কাতার, সৌদি আরব, তুরস্ক এবং অন্যান্য মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর এ পর্যন্ত নেওয়া প্রচেষ্টার আমরা প্রশংসা করি’। বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, অস্ট্রেলিয়া দীর্ঘদিন ধরেই উপসাগরীয় অঞ্চলের পাশাপাশি লেবাননেও উত্তেজনা হ্রাস ও সংঘাতের অবসানের আহ্বান জানিয়ে আসছিল।

ফ্রান্স

ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে পাকিস্তানের ভূমিকার কথা স্বীকার করে বলেন, এ চুক্তিটি একটি সমন্বিত কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফসল, যেখানে বেশ কয়েকটি অংশীদার অবদান রেখেছে। তিনি যুদ্ধরত সব পক্ষকে এটি দ্রুত এবং সম্পূর্ণ বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।

জাপান

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি শান্তি প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশের ভূমিকার প্রশংসা করে বলেন, ‘পরিস্থিতি সমাধানের দিকে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে আমরা এ সমঝোতা স্মারককে স্বাগত জানাই। এটি সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কূটনৈতিক সমাধান এবং অবিরাম আলোচনার ফল’।তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, এ সমঝোতা স্মারকটি বাস্তবায়িত হলে হরমুজ প্রণালিতে মুক্ত ও নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত হবে।

জার্মানি

জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি চুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে ট্রাম্প এবং ইরান পক্ষকে এ কূটনৈতিক সাফল্যের জন্য অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এটি বিশ্ব অর্থনীতির পুনরুদ্ধার এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তার পথ প্রশস্ত করতে পারে’।

নিউজিল্যান্ড

নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইনস্টন পিটার্স এক্সে দেওয়া এক পোস্টে এ চুক্তিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চলে উত্তেজনা হ্রাস এবং স্থিতিশীলতা বৃদ্ধির পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি জানান, যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় নিউজিল্যান্ডের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, এখন এটি খুলে দেওয়ার ফলে প্রধান সরবরাহ চেইনগুলোতে আস্থা ফিরে আসবে।

সংঘাতের শুরু থেকেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ আসিম মুনির যুদ্ধরত দেশ দুটির মধ্যে শান্তিপূর্ণ কূটনৈতিক আলোচনার জন্য সক্রিয় প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছিলেন।  উল্লেখ্য, এর আগে গত এপ্রিলেও পাকিস্তান সরকারের প্রচেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রথম সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তি সম্ভব হয়েছিল।