আর্কাইভ | ঢাকা, শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১ ফাল্গুন ১৪৩২, ২৫ শাবান ১৪৪৭ ১২:৩৮:৫০ পূর্বাহ্ন
Photo
বিশেষ প্রতিবেদক 
ঢাকা, প্রকাশিতঃ
১৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
১০:৪৩:৪৩ পূর্বাহ্ন

দুই দশক পর যেভাবে ক্ষমতায় ফিরছে বিএনপি


বাংলাদেশে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি সরকার গঠনের জন্য নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে । নির্বাচন কমিশনের দেওয়া বেসরকারি ফল অনুযায়ী দলটি সংসদের দুই তৃতীয়াংশ আসনে জয় পেয়েছে।

দলটি এবারই প্রথম বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে নির্বাচনে অংশ নিলো এবং মি. রহমান নিজেও এবার প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেন।

তিনি ঢাকা ও বগুড়ার দুটি আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। ফলে বিএনপির আগের ঘোষণা অনুযায়ী সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রধান হিসেবে মি. রহমানই বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন। নির্বাচনে বিজয়ের জন্য তিনি ইতোমধ্যেই ভারত ও পাাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের নেতাদের কাছ থেকে অভিনন্দন পেতে শুরু করেছেন।

দীর্ঘ সতের বছর লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকার পর তিনি গত ২৫শে ডিসেম্বর ঢাকায় ফিরেছিলেন এবং ৩০শে ডিসেম্বর তার মা খালেদা জিয়ার মৃত্যুর কয়েকদিন পর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন।

এখন তার নেতৃত্বেই নির্বাচনে দুই তৃতীয়াংশ আসনে বিএনপির জয় নিশ্চিত হলো এবং এর ফলে ২০০৬ সালের অক্টোবরে ক্ষমতা থেকে বিদায় নেওয়ার প্রায় দুই দশক পর দলটি আবার ভোটের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে।

এর আগে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারে ছিল । সেই সরকারের অন্যতম অংশীদার এবং দলটির দীর্ঘদিনের মিত্র রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর সাথেই এবার নির্বাচনী লড়াই হয়েছে বিএনপির।

জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট এ নির্বাচনে এখন পর্যন্ত ৭৮টি আসন পেয়েছে। এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামী এককভাবেই ৬৮টি সংসদীয় আসনে বিজয়ী হয়েছে।

এবার ২৯৯ টি সংসদীয় আসনে নির্বাচন ও গণভোট একই সঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, এই নির্বাচনে ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ ভোট পড়েছে। এর মধ্যে দুটি আসনে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া ফল ঘোষণা স্থগিত রেখেছে কমিশন।


নির্বাচনের মাত্র মাসখানেক আগে মায়ের মৃত্যুর পর দলটির চেয়ারম্যান হিসেবে অভিষিক্ত হয়েছিলেন তিনি। এর আগে দীর্ঘ সতের বছর লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকার পর গত বছরের ২৫শে ডিসেম্বর তিনি ঢাকায় ফিরলে দলের পক্ষ থেকে তাকে বর্ণাঢ্য সম্বর্ধনা জানানো হয়।

বিএনপির দিক থেকে আগেই বলা হয়েছিলো যে, মি. রহমানই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার দলকে নেতৃত্ব দিবেন এবং তিনি নিজেও অংশ নিবেন।

যদিও ফেরার আগে তার একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে তাকে নিয়ে দলের ভেতরে ও বাইরে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।

নভেম্বরের শেষ দিকে তার মা খালেদা জিয়া যখন অসুস্থ, তখন তার ওই পোস্ট আলোচনার ঝড় তুলেছিল এবং তিনি ফিরতে পারবেন কি-না সেই আলোচনায় ও সংশয় তখন তুঙ্গে উঠেছিল।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি ২৫শে ডিসেম্বর ঢাকায় ফিরে আসেন। এর কয়েকদিন পরেই ৩০শে ডিসেম্বর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান খালেদা জিয়া।

এরপর ৯ই জানুয়ারি দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আনুষ্ঠানিকভাবে দলের চেয়ারম্যানের পদে অভিষিক্ত হন তিনি।

শেষ পর্যন্ত তার নেতৃত্বেই দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে দুই দশক পর আবারো রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করতে যাচ্ছে বিএনপি।

এর আগে ২০০১ সালের নির্বাচনে ক্ষমতায় আসা বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের শেষ দিকে ২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কে হবেন-এই ইস্যুতে রাজনৈতিক সংকট তুঙ্গে উঠেছিল।

তখন আন্দোলনরত আওয়ামী লীগ ও সমমনা দলগুলো বিচারপতি কে এম হাসানকে পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে মেনে নিতে রাজি না হওয়ায় জটিলতা বাড়ে। এক পর্যায়ে ২০০৬ সালের ২৯শে অক্টোবর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব পালনের জন্য শপথ নেন তৎকারীন রাষ্ট্রপতি প্রফেসর ইয়াজউদ্দিন আহমেদ।

কিন্তু এরপরেও রাজনৈতিক সংকট আরও বাড়তে থাকে এবং এ নিয়ে তুমুল সহিংসতার মধ্যে ২০০৭ সালের ১১ই জানুয়ারি সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করেন।

ওই সরকারের আমলে গ্রেফতার হয়ে পরে মুক্তি পেয়েছিলেন তখনকার আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া।

সেই সরকারের সময়েই ২০০৭ সালে মার্চে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে দুর্নীতির অভিযোগে আটক হয়েছিলেন তারেক রহমান।

তখন আঠারো মাস কারাগারে থাকার পর ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে মুক্তি পেয়ে সপরিবারে লন্ডনে চলে গিয়েছিলেন তিনি।

এরপর থেকে তিনি সেখানে রাজনৈতিক আশ্রয় পান এবং পরে ধীরে ধীরে সেখান থেকেই দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হতে শুরু করেন।

এর আগে ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনের সময়ই দলের ভেতরে সক্রিয় হয়ে উঠতে থাকেন তারেক রহমান। পরে ২০০২ সালের ২২শে জুন দলের মধ্যে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদ তৈরি করে তাকে ওই পদে অধিষ্ঠিত করা হয়।

এরপর ২০০৯ সালে দলের পঞ্চম জাতীয় সম্মেলনে তিনি সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান মনোনীত হয়েছিলেন। প্রয়াত মিসেস জিয়া ২০১৮ সালে একটি দুর্নীতি মামলায় কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবার পর লন্ডনে থেকেই দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন মি. রহমান।

বিএনপি সরকারের সময়ে প্রধানমন্ত্রীর পুত্র হিসেবে তারেক রহমানের বেশ প্রভাব ছিল। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হলেও তারেক রহমানই হয়ে উঠেছিলেন সমান্তরাল আরেকটি ক্ষমতার কেন্দ্র - হাওয়া ভবন-কেন্দ্রিক।

দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল মি. রহমান ও তার ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধেও। যদিও তিনি ও তার দল বিএনপি সবসময় এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে এগুলোকে তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের 'অপপ্রচার' বলে দাবি করে আসছেন।

বিএনপির ওই মেয়াদে ২০০৪ সালে ঢাকায় তখনকার বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলার জন্যও তারেক রহমান ও হাওয়া ভবনকেই দায়ী করেছিলো আওয়ামী লীগ।

পরে আওয়ামী লীগ আমলে এ সংক্রান্ত মামলার আসামিও করা হয়েছিলো তারেক রহমানকে, যাতে তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছিলো। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এসব মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন তারেক রহমান।

এবার মি. রহমানের নেতৃত্বে বিএনপিকে মূলত লড়তে হয়েছে জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে। দলটি ২০০১ সালের সরকারে বিএনপির সবচেয়ে বড় মিত্র ছিল।

ভিন্ন প্রেক্ষাপট ও সংসদ নির্বাচনের ফল
বিএনপি এবার নির্বাচনের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও এই নির্বাচনে ছিল না দলটির দীর্ঘকালের প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ। ২০২৪ সালের অগাস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে শেখ হাসিনা ও তার দলের অনেক নেতা ভারতে অবস্থান করছেন। আর দলটির যেসব নেতা দেশে ছিলেন, তাদের প্রায় সবাইকেই গ্রেফতার করে কারাগারে রেখেছে অন্তর্বর্তী সরকার। দলটির কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করেছে সরকার । ফলে এই নির্বাচনে দলটি অংশ নিতে পারেনি।

এমন প্রেক্ষাপটে নির্বাচনে বিএনপির লড়াই হয়েছে পুরনো মিত্র জামায়াতে ইসলামীর সাথে। যদিও দলটি বিএনপির সাথে এ নির্বাচনী লড়াইয়ে খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি। যদিও নির্বাচনে তাদের আসন সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে।

নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত ফল অনুযায়ী বিএনপি ও তার মিত্ররা মিলে এখন পর্যন্ত ২১২ টি আসনে জয়লাভ করেছেন। আরও কয়েকটি আসনে ফলাফল ঘোষণা এখনো বাকী রয়েছে।

এছাড়া দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে জয়লাভ করেছেন কয়েকজন বিএনপি নেতা। যদিও দলীয় সিদ্ধান্ত না মানায় তাদের ইতোমধ্যেই দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তারেক রহমান ছাড়াও দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলটির সিনিয়র নেতাদের যারা নির্বাচন করেছিলেন তারা প্রায় সবাই ভোটে জয়লাভ করেছেন।

বিএনপি এই নির্বাচনে ২৯২ টি আসনে এককভাবে প্রার্থী দিয়েছিলো এবং সমমনা দলগুলোকে বাকী আটটি আসন ছেড়ে দিয়েছিল। তবে দলটির কুমিল্লা-৪ আসনের প্রার্থী মনজুরুল আহসান মুন্সী প্রার্থিতা বাতিল হয়েছিল ঋণখেলাপি হওয়ার কারণে।

নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী বিএনপির সমমনা দলগুলোর মধ্যে আন্দালিভ রহমান পার্থ, জোনায়েদ সাকি এবং নুরুল হক বিজয়ী হয়েছেন।

অন্যদিকে বিএনপির প্রধান প্রতিপক্ষ জামায়াতে ইসলামী জোট ৭৭ আসনে জিতলেও দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এবং সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ এই নির্বাচনে হেরে গেছেন।

তবে জামায়াত জোটে থাকা এনসিপির নাহিদ ইসলাম, আখতার হোসেন, হাসনাত আবদুল্লাহ, আবদুল হান্নান মাসউদ, আবদুল্লাহ আল আমিন ও আতিকুর রহমান মোজাহিদ এই নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন।

ওদিকে বিএনপিরই বিদ্রোহী নেতাদের মধ্যে রুমিন ফারহানা ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২, এজেডএম রেজওয়ানুল হক দিনাজপুর-৫, আতিকুল আলম শাওন কুমিল্লা-৭ এবং সালমান ওমর রুবেল ময়মনসিংহ-১ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয়লাভ করেছেন।


নির্বাচনের ফল নিয়ে দুই দলের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে করা পোস্টে নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে দলটি।

পোস্টে বলা হয়, নির্বাচনের ফলাফল তৈরি ও ঘোষণার ধরন জামায়াতের কাছে পরিষ্কার নয়। অনেক জায়গায় দলটির প্রার্থীরা অল্প ভোটের ব্যবধানে রহস্যজনকভাবে হেরে গেছেন। ফলাফলে বারবার গরমিল ও সাজানো মনে হয়েছে জামায়াতের। প্রশাসন নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করেনি বলে দাবি করেছে দলটি।

সেই সাথে জোটের পরবর্তী ঘোষণা না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা ও ধৈর্য ধরার অনুরোধ করা হয়েছে জামায়াতের পক্ষ থেকে।

অন্যদিকে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র ও দলীয় চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন নির্বাচনে বিএনপির বিজয় নিয়ে অনুভূতি জানাতে গিয়ে বলেছেন, "এই বিজয় গণতন্ত্রের, এই বিজয় বাংলাদেশের"।

দলের গুলশান কার্যালয়ের বাইরে সাংবাদিকদের সামনে তিনি বলেন, "আমরা বিশ্বাস করি জনগণের যে আস্থা, বিশ্বাস ভালোবাসা আমাদের নেতা তারেক রহমান পেয়েছেন, তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রতিটি মানুষের অধিকার ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করবেন"। সূত্র: বিবিসি বাংলা