ওপরে বাঁ থেকে নূর মোহাম্মদ, জাহাঙ্গীর ও আসাদুল ইসলাম- নিচে বাঁ থেকে ইমদাদুল, মফিজুল, রুবেল ইসলাম ও হাসিনুর রহমান। ছবি: এসআরবি
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় পাঁচ সরকারি কর্মচারীসহ সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত বুধবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত রাজধানী ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করে এসআরবি-৩। প্রাথমিক তদন্তে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের প্রশ্নপত্র সংগ্রহ, উত্তর প্রস্তুত ও পরীক্ষার্থীদের কাছে সরবরাহের সঙ্গে সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কম্পিউটার অপারেটর এস এম ইমদাদুল ইসলাম ও জাহাঙ্গীর, একই প্রতিষ্ঠানের অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদ, পরিবেশ অধিদপ্তরের ডেটা এন্ট্রি অপারেটর মো. রুবেল ইসলাম, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক আসাদুল ইসলাম, চক্রের সদস্য হাসিনুর রহমান সুজন এবং চাকরিপ্রার্থী মো. মফিজুল ইসলাম।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে ১০০ টাকা মূল্যমানের ১১৬টি ও ৫০ টাকা মূল্যমানের চারটি স্ট্যাম্প, এক সেট প্রশ্নপত্র, বিভিন্ন পরীক্ষার প্রবেশপত্র ও সনদপত্র, বিভিন্ন ব্যাংকের চেক, আটটি মোবাইল ফোন, ছয়টি জাতীয় পরিচয়পত্র এবং নগদ চার হাজার টাকা জব্দ করা হয়েছে।
শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এসআরবি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা হোয়াটসঅ্যাপে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। প্রশ্নপত্র সংগ্রহ, উত্তর প্রস্তুত এবং বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে তা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে চক্রের সদস্যদের পৃথক ভূমিকা ছিল। প্রাথমিক তদন্তে সম্ভাব্য গ্রাহক, সরবরাহকারী ও মধ্যবর্তী বিতরণকারীদের একটি চক্রের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।
যেভাবে ছড়িয়ে পড়ে প্রশ্নপত্র
এসআরবি-৩ জানায়, গত বুধবার মতিঝিল এলাকা থেকে রুবেল ইসলাম, মফিজুল ইসলাম ও হাসিনুর রহমান সুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। রুবেল পরিবেশ অধিদপ্তরের ডেটা এন্ট্রি অপারেটর এবং মফিজুল চাকরিপ্রার্থী। মফিজুল এ চক্রের এক সদস্যকে ১৭ লাখ টাকা দিয়ে প্রতারিত হয়েছিলেন। পরে আরও অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যে তিনি চক্রটির সঙ্গে যুক্ত হন বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে।
গ্রেপ্তার তিনজনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চক্রের আরও দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের একজন এনবিআরের কম্পিউটার অপারেটর এস এম ইমদাদুল ইসলাম। তাকে ঢাকার উত্তরখান থেকে এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক আসাদুল ইসলামকে মিরপুর-১০ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন সাভার থেকে এনবিআরের অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদকে এবং শুক্রবার সকালে মোহাম্মদপুর থেকে এনবিআরের কম্পিউটার অপারেটর জাহাঙ্গীরকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এসআরবি জানায়, পরীক্ষার দিন ভোর পৌনে ৫টার দিকে একটি সূত্র থেকে প্রশ্নপত্রের অস্পষ্ট ছবি পান নূর মোহাম্মদ। পরে সকাল সোয়া ৬টার দিকে জাহাঙ্গীর তাকে প্রশ্নপত্রের স্পষ্ট ছবি পাঠান। নূর মোহাম্মদ ওই প্রশ্নপত্রের উত্তর প্রস্তুত করে জাহাঙ্গীর ও ইমদাদুলের কাছে পাঠান। পরে চক্রের সদস্যরা নিজেদের এবং প্রশ্নপত্র বিতরণের কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের মাধ্যমে তা ছড়িয়ে দেন বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে।
এ কাজে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক আসাদুল ইসলাম, পরিবেশ অধিদপ্তরের ডেটা এন্ট্রি অপারেটর রুবেল ইসলাম, চাকরিপ্রার্থী মফিজুল ইসলাম এবং পরীক্ষার্থী সংগ্রহের দায়িত্বে থাকা হাসিনুর রহমান সুজন যুক্ত ছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে তথ্য পেয়েছে এসআরবি।
প্রশ্ন ফাঁসের উৎস শনাক্তে তদন্ত
প্রশ্নপত্র ফাঁসের উৎস সম্পর্কে লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে নূর মোহাম্মদ জানিয়েছিলেন, তিনি ফেসবুকের মাধ্যমে প্রশ্নটি পেয়েছেন। পরে প্রশ্নটি জাহাঙ্গীরকে দেন। তবে তার দেওয়া তথ্য সঠিক বলে মনে হয়নি। আমাদের তদন্ত চলছে। সরকারি একাধিক কর্মচারীর নাম এসেছে। কোনো কর্মকর্তা জড়িত আছেন কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। মূলত যে জায়গা থেকে প্রশ্নটি ফাঁস হয়েছে, সেটি বের করার চেষ্টা চলছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই প্রশ্ন ফাঁসের একাধিক ধাপ রয়েছে। নূর মোহাম্মদ অন্য একজনের মাধ্যমে প্রশ্নটি পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কোনো কর্মকর্তার জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া যায়নি।’
এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক জানান, প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে একটি মাত্র চক্র জড়িত, বিষয়টি এমন নয়। একাধিক চক্র বিভিন্ন স্তরে এ কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকতে পারে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে নূর মোহাম্মদকে আপাতত মূল হোতা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। চক্রের সদস্যরা আলাদাভাবে যোগাযোগ করতেন এবং নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের বিষয়টি গোপন রাখতেন।
তিনি বলেন, চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে আট থেকে ১০ লাখ টাকা করে নেওয়ার তথ্য প্রাথমিকভাবে পাওয়া গেছে। তবে একেকজনের কাছ থেকে নেওয়া অর্থের পরিমাণ ভিন্ন ছিল। এ বিষয়ে আরও তদন্ত চলছে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ ও উদ্ধার করা আলামত বিশ্লেষণ করে প্রশ্নপত্র ফাঁসের মূল উৎস, সরবরাহের বিভিন্ন ধাপ এবং এর সঙ্গে জড়িত অন্য ব্যক্তিদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে বলে জানান লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন।
